কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বোমা ফাটালেন
লেখক: অজয় দাশগুপ্ত
১৯৭১ সালের পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশ ভুখণ্ডে মুক্তিবাহিনী ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। তারা দেশের সর্বত্র গুলি-বোমায় নাস্তানাবুদ করছিল খানসেনাদের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও দিল্লি সফরকালে সেটা ভালোভাবেই অবহিত হতে পেরেছেন। স্বদেশে ফিরে তিনি নিজেও বোমা ফাটালেন, যা কাঁপিয়ে দিল হোয়াইট হাউসকে। রিচার্ড নিক্সন ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের বর্বর গণহত্যা শুরুর পর থেকেই দাবি করে আসছিলেন—পাকিস্তানের সৈন্যরা তাদের দেওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে না। তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু এডওয়ার্ড কেনেডি কংগ্রেসের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাকিস্তানে ২০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীও পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে।
এডওয়ার্ড কেনেডি আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারত সফর শেষে স্বদেশে ফিরে গিয়ে যে ঝামেলা বাধাবেন—সেটা প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ধুনন্ধর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন।ইন্ডিয়াস সিক্রেট ওয়ার ইন ইস্ট পাকিস্তানগ্রন্থে গ্যারি জে ব্যস লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার এটা ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, কেনেডি ফিরে এসে ছাদ উড়িয়ে দেবেন। তিনি ঠিকই ভেবেছিলেন। সিনেটর ভারতে যা দেখে এসেছেন তাতে দারুণ ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং নিক্সনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটান।’
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে কেনেডি বলেন, ‘আধুনিককালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানব দুর্ভোগের ঘটনা এটা।’ তিনি নিষ্ঠুরতা, হত্যাকাণ্ড, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি শরণার্থী শিবিরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এমন শিশু দেখেছেন, যাদের শরীর একেবারে 'হাড্ডিআর'। তিনি এমন অনেকের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, যাদের নিকটজনকে তাদের চোখের সামনেই হত্যা করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। ১০ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে তার দেখা হয়, যে কলেরায় মৃত ছোট ভাইয়ের দেহে ঢেকে দেওয়ার জন্য কিছু একটা খুঁজছিল।
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে কাদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে—সেটাই ছিল এডওয়ার্ড কেনেডির প্রশ্ন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দশ বছর ধরে যে বন্দুক, মেশিনগান, ট্যাংক ও বিমান পাকিস্তানকে সরবরাহ করছে, সেটাই পূর্ব বাংলার জনগণের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। নিক্সন এবং তার সহযোগীরা যদিও প্রকাশ্যে বলছিলেন যে, তারা কোনো পক্ষে নেই। কিন্তু কেনেডি সেটা মানতে চাননি। তিনি বলেন, তারা ইয়াহিয়া খানের পক্ষ নিয়েছেন। তারা ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছেন। পূর্ব বাংলায় আমাদের বন্দুক ব্যবহার করা হচ্ছে। গত দুই দশক ধরে পাকিস্তানকে যে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, তার ব্যবহার করা হচ্ছে।
এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থী শিবিরে বসবাসরতদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, তাদের খুব সামান্য সহয়তাই বিভিন্ন দেশ থেকে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান একেবারেই নগণ্য। তিনি বলেন প্রথম কাজ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের যে অস্ত্রের ব্যবহারের কারণে এই শরণার্থী সমস্যা ও বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে বিব্রত করার জন্য তিনি ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে বলে দাবি করে। অথচ ওই দেশ থেকে দুই হাজার মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত একটি দেশে জনগণের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে, তার ফল যে সামরিক জান্তা মানছে না, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে নীতি ও আদর্শের প্রতি যুগ যুগ ধরে অনুগত, সেটাই এখন অনুসরণ করা হচ্ছে না। এখন আমেরিকা সামরিক নিপীড়নের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। সামরিক নিষ্ঠুরতাকে মদদ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে সরাসরি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চাপ দেওয়ার। পাকিস্তানকে সব ধরনের অস্ত্র ও অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দিতে হবে। পূর্ব বাংলায় যে নৃশংসতা চলছে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র সর্মথন করে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments